ধর্মব্যবসায়ী সংগঠন ইসকন : প্রতিষ্ঠার অজানা ইতিহাস


বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার পতনের পর সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার দাবিতে বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি অংশ বিরতিহীন আন্দোলনে নেমেছে। এই আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা ‘ইসকন নেতা’ চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় আটকের পর তার অনুসারীরা পরিকল্পিত ও পূর্বঘোষিত হামলা চালিয়ে চট্টগ্রামে রাজপক্ষের এক মুসলিম আইনজীবী এডভোকেট সাইফুল ইসলাম আলিফকে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করেছে।


এই ঘটনার পর দেশজুড়ে ইসকনের কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে। একদিকে তাদের ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের আড়ালে রাজনৈতিক এবং সামাজিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ, অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় তাদের নাম জড়িয়ে পড়া—সবই জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক এই হামলা ইসকনের দীর্ঘদিনের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের একটি ধারাবাহিক প্রতিফলন।


অনেকেই দাবি করছেন, ইসকন কেবলমাত্র ধর্মীয় সংগঠন নয়; এটি একটি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক, যা ধর্মীয় প্রচারণার পাশাপাশি রাজনৈতিক দাঙ্গা এবং অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যেও সক্রিয়। তাদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচকদের একাংশ দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, ইসকনের আড়ালে চলছে এক ধরনের “গ্লোবাল এজেন্ডা”।


উপরোক্ত দাবির প্রমাণ মেলে যদি ইসকন প্রতিষ্ঠার গোড়ার ইতিহাসের দিকে তাকানো যায়। সাধারণ্যে যদিও প্রচার করা হয় এটি একটি ধর্মীয় সংগঠন, কিন্তু এর প্রতিষ্ঠার ইতিহাস আমাদের ভিন্ন কিছু বলে। চলুন জেনে নিই ইসকনের প্রতিষ্ঠা ও বিকাশের সেই অজানা ইতিহাস।


দাবি করা হয় ইসকন সংগঠনটি হিন্দু ধর্মের দেবতা শ্রী কৃষ্ণকে ঘিরে তৈরি। যার পূর্ণরূপ হলো, ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর কৃষ্ণ কনশাসনেস। এর প্রতিষ্ঠাতা হলেন, অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিভেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ। প্রভুপাদ এই অরগানাইজেশানটি ১৯৬৬ সনে নিউইয়র্ক সিটিতে প্রতিষ্ঠা করেছেন। যদিও এর হেডকোয়ার্টার ওয়েস্ট বেঙ্গল ইন্ডিয়াতে স্থাপিত। বিশ্বজুড়ে সর্বমোট ১ মিলিয়ন সদস্য তাদের এই অরগানাইজেশানের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। 


কিন্তু যেভাবে দাবি করা হয়, এই অর্গানাইজেশনটি হিন্দুদের কৃষ্ণকে ঘিরে তৈরি, বাস্তবেই কি তাই? হিন্দুদের ইন্ধনেই কি চলছে ইসকনের অপতৎপরতা? নাকি আড়ালে ছরি ঘুরাচ্ছে অন্য কেউ, যারা ধর্মের আড়ালে নিজেদের রাজনৈতিক, সামাজিক কিংবা অর্থনৈতিক স্বার্থসিদ্ধি করছে? ইসকনের কার্যক্রম কি শুধুমাত্র ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ, নাকি এর পেছনে রয়েছে বৃহৎ কোনো পরিকল্পনা?


এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার জন্য আমাদের গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে ইসকনের কর্মকাণ্ড, নেতৃত্ব এবং আর্থিক সংস্থানগুলোর উৎস।


স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, প্রভুপাদ হিন্দু ধর্মের ভগবানের নামে সংগঠন তৈরি করতে কেন নিউইয়র্কে গেলেন? নিউইয়র্ক কি হিন্দু অধ্যুষিত শহর? কিংবা হিন্দুদের কোনো পূণ্যভূমি? উত্তর হলো- না। তাহলে প্রভুপাদ সেখানে গেলেন কেন? কথায় আছে কান টানলে মাথা আসে। আমরা যদি এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজি, তবেই বুঝতে পারব ইসকন নামক ঘুড়ির নাটাই আসলে কার হাতে?

 

সময়টা ছিল ১৯৬৬ সাল। একে তো তখন আমেরিকা ভিয়েতনাম যুদ্ধ চলছিল। সে-সময় আবার H2N2 নামক ভাইরাসের শিকার হয়ে অনেক মানুষ মারা যায়। তার উপর অবৈধ সম্পর্ক স্থাপনে STD অর্থাৎ Sexually Transmitted Disease (এটি এমন যৌনবাহিত রোগ যা অবৈধ যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে একজন থেকে অন্যজনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে) হতে থাকে পশ্চিমা নাগরিকদের।


এসব কারণে তখন কিছু মানুষ ডিপ্রেশনে ভোগতে থাকে। আর এই বিষণ্নতা থেকেই মানুষগুলো ক্ষোভের বশে এমন কাজগুলো করতে থাকে, যেগুলো করতে সৃষ্টিকর্তা নিষেধ করেছেন। তারা দুনিয়ার নিয়ম-কানুন ভেঙে নিজেদের মতো করে একটি আলাদা কালচার তৈরি করে। যেখানে তারা অদ্ভুত পোশাকাশাক পড়তে শুরু করে। মাংশাসী খাবার পরিহার করে ভ্যাজিটেরিয়ান হয়ে যায়। লম্বা লম্বা চুল রেখে দেয়। কোট-প্যান্ট বাদ দিয়ে জংলীদের মতো রঙ-বেরঙের  কাপড়-চোপড় পড়তে শুরু করে। এমনকি তাদের আচার-আচরণেও ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। রাস্তায় রাস্তায় আওয়ারার মতো নেচে বেড়াতে থাকে। পাশাপাশি এই  পাগলামির মাত্রা বাড়াতে মারিজুয়ানা (Marijuana) এবং এলএসডির (LSD) মতো ড্রাগ ব্যবহার করে। এর সঙ্গে চিত্ত-বিনোদন ও মানসিক প্রশান্তির জন্য যুক্ত করে রক মিউজিক।


স্বাভাবিক জীবন থেকে বেরিয়ে এসে অদ্ভুত এক সমাজবিরোধী কালচার তৈরি করা সেই লোকগুলোকে বলা হয় 'হিপ্পি'। মূলত ষাটের দশকে ইউনাইটেড স্টেট এর বিভিন্ন জায়গায় এইসব হিপ্পিদের উদ্ভাবন হয়েছিল।

 

রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে নেচে-গেয়ে পাগলামি করে বেড়ানো সেই হিপ্পিদেরকেই টার্গেট করেছিল ভক্তিভেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ। হিপ্পিদের মানসিক ভারসাম্যহীনতা ও ডিপ্রেশনের সুযোগ নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছিল ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর কৃষ্ণ কনশাসনেস (ISCON)। কিন্তু কিভাবে?

দেখুন, কথায় আছে- ‘মানুষ অভ্যাসের দাস’। সুতরাং তাদেরকে নতুন একটি আদর্শে অভ্যস্ত করতে চাইলে তাদের পুরোনো আদর্শে অভ্যস্ত বিষয়গুলোতে ব্যাপক পরিবর্তন আনা এবং সেগুলোর বিকল্পে নতুন কিছুতে অভ্যস্ত করা জরুরি। প্রভুপাদ খুব বুদ্ধিমত্তার সাথে সর্বপ্রথম সে-দিকটায় নজর দেয়। 


হিপ্পিরা তো অলরেডি ভ্যাজিটেরিয়ান হয়ে গিয়েছিল, তাই এখানে প্রভুপাদের নতুন করে কোনো কিছু যুক্ত করতে হয়নি। কিন্তু গান বাজনার সাথে নাচানাচির যে ব্যাপারটা, সেটাকে হালকা মডিফাই করেছে সে। যেখানে তারা রক মিউজিক বাজিয়ে উদ্দেশ্যহীন নাচানাচি করত, সেই জায়গায় তাদেরকে গিটারের পরিবর্তে ঢোল তবলা ধরিয়ে দেওয়া হলো। অর্থাৎ মিউজিক, ড্যান্স বা নৃত্য তার জায়গাতেই রয়েছে। শুধু নাচ গানের সাথে কৃষ্ণের নাম নেওয়ার বিষয়টা যুক্ত করেছে প্রভুপাদ। একইভাবে ড্রাগের পরিবর্তে তাদেরকে ধরিয়ে দেওয়া হল প্রসাদ। 


এভাবেই কিছু আওয়ারা ও মানসিক ভারসাম্যহীন হিপ্পিদেরকে নিয়ে ইসকন প্রতিষ্ঠা করা হয়। কিন্তু নাম দেওয়া হয় কৃষ্ণের সংগঠন। হিপ্পিরা মনে করতে লাগল, সেই একই পাগলামি যেটা আমরা আগে করেছি, তার মাধ্যমে যদি সৃষ্টিকর্তার আরাধনা করা যায়, তাহলে ক্ষতি কী।


উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা এটাই প্রতীয়মান হয় যে, ইসকনের কার্যক্রম মোটেও সনাতন ধর্মের উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়নি। বরং এটা তৈরি করা হয়েছিল হিপ্পিদের পাগলামি এবং খেয়ালখুশি থেকে। এজন্য স্বয়ং হিন্দু পন্ডিতরাই ইসকনের বিরুদ্ধে কথা বলে।


মজার বিষয় হলো, ইসকন সদস্যদের সিংহভাগই নিজেদের কখনোই হিন্দু দাবি করে না। বরং তারা নিজেদের ইসকন অরগানাইজেশানের সদস্য হিসেবে পরিচয় দেয়। অতএব, পশ্চিমে যত ইসকন সদস্য রয়েছে তারা প্রকৃতপক্ষে হিপ্পি-ই রয়ে গেছে।


প্রশ্ন হতে পারে, এধরণের কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে বা বাহিরের দেশ থেকে এসে একটা অরগানাইজেশান দাঁড় করানোর ব্যাপারে কেন আমেরিকার গভর্মেন্ট কখনো কোনো বাধা প্রধান করেনি? 


উত্তর হলো, এর পেছনে বেশ জোরালো একটা কারণ রয়েছে। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, মেক্সিকো, জাপান, রাশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ কৃষ্ণের নামে ইসকনের মন্দির বানিয়ে রেখেছে। যেই মন্দিরগুলো তাদের ইনকামের বড় একটা সোর্স। এসব মন্দির থেকে প্রতিবছর বেশ মোটা অংকের টাকা আমেরিকায় ট্রান্সফার করা হয়। এমনকি বিভিন্ন দেশে থাকা এই মন্দিরগুলোর উপর কোনো ইনকাম ট্যাক্সও নেই।

 

আপনি জেনে অবাক হবেন, ব্যাঙ্গালোরের ইসকন মন্দির প্রতিবছর এ পরিমাণ অর্থ আমেরিকায় পাঠায়, যা আমেরিকার কোলগেট কোম্পানি এক বছরেও কামাতে পারে না। অথচ এই কোলগেট কোম্পানি ২০২৩ সালে প্রায় ১৯.৪৬ বিলিয়ন ডলার আয়ের প্রতিবেদন দিয়েছে রয়টার্সকে। এমনকি কোলগেট কোম্পানি ভারতে তাদের পণ্য বিক্রি করে যত না ইনকাম করে, তার থেকে তিন গুন বেশি টাকা শুধু ব্যাঙ্গালোরের ইসকন মন্দিরই আমেরিকায় ট্রান্সফার করে। তাছাড়া ব্যাঙ্গালোরের চেয়ে বড় ইসকন মন্দির দিল্লিতে আছে, তারচেয়ে বড় ইসকন মন্দির আছে মুম্বাইয়ে। শুধু তাই নয় এর চেয়েও বড় ইসকন মন্দির মাথুরায় হয়ে গেছে প্রায়। এবার চিন্তা করুন, কেন আমেরিকা প্রভুপাদের এই আন্দোলনে নীরব সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।


ইসকন যে কেবল নিজেকে রেলিজিয়স অর্গানাইজেশান দাবি করে ধর্ম ব্যবসা করছে ও মিলিয়ন মিলিয়ন টাকা পাচার করছে বিষয়টা এমন নয়। ওদের পাপের ফিরিস্তি আরও দীর্ঘ। বরং এর চেয়ে জঘন্য কুকর্মের  ইতিহাস তাদের রয়েছে, যা স্বয়ং ইসকনই স্বীকার করে নিয়েছে। 


সেসব কুকর্মের অন্যতম হলো- শিশু বলাৎকার। হিন্দু ধর্মের মহাগ্রন্থ গীতার বিকৃত অনুবাদ করে প্রভুপাদ। এই অনুবাদে সে জায়গায় জায়গায় মনগড়া বানোয়াট সব শ্লোক বলে গুরুভক্তির কথা উল্লেখ করেছে। যা পরবর্তীতে অভিজ্ঞ হিন্দু পন্ডিতরা উন্মোচন করে দেন। মূলত প্রভুপাদের এই বিকৃত অনুবাদ পাঠদানের মাধ্যমে গুরুকুলে (বিদ্যালয়) থাকা অবুঝ শিশুদের গুরুভক্তির প্রতি বাধ্য করা হয়। সেই সুযোগ নিয়ে ইসকন পুরোহিতরা সেসব কোমলমতি শিশুদের বলাৎকার করে।


ইসকনের বিভিন্ন গুরুকুল থেকে শিশুদমন এবং যৌন নির্যাতনের অভিযোগ অনেকদিন ধরেই উঠেছে। বহু অভিযোগ পাওয়া গেছে যে, ইসকন সদস্যরা শিশুদের শারীরিক এবং মানসিকভাবে নিগৃহীত করেছে। বিশেষ করে ১৯৭০-৮০-এর দশকে, যখন ইসকন দ্রুত বিস্তার লাভ করছিল, তখন বহু শিশুকে ইসকনের গুরুকুলে পাঠানো হতো এবং সেখানে তাদের ওপর যৌন নির্যাতন করা হতো। কিন্তু অধিকাংশ সময়ই ইসকন নেতারা সেই অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে চিন্ময় কৃষ্ণের শিশু বলাৎকারের ঘটনাটিও ইতিমধ্যে গণমাধ্যমগুলোর অনুসন্ধানে আমরা জানতে পেরেছি। যা শিশু বলাৎকারের সুস্পষ্ট প্রমাণ।


এছাড়াও অর্থপাচার ও ট্যাক্স ফাঁকি, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ধর্মীয় দাঙ্গা, ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক কথাবার্তা বলে মালাউনদের উস্কানি দেওয়া, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যঙ্গচিত্র তৈরি করা, বিভিন্ন ঐতিহাসিক মসজিদ ভেঙ্গে মন্দিরে রূপান্তরিত করার মতো দুঃসাহসিক কাজ অনায়াসেই আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছে এই সংগঠন। 


শেষ কথা হলো, ইসকন হিন্দুদের ব্যানারে কাজ চালিয়ে গেলেও, বেপরোয়া কিছু সাধারণ মালাউন ছাড়া সবাই এটাই স্বীকৃতি দেয় যে, ইসকন কোনো হিন্দু ধর্মীয় সংগঠন নয়। হিন্দুদের ধর্মীয় আদর্শ ও রীতিনীতিও তারা মেনে চলে না। বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইসকনের আদর্শ হিন্দু ধর্মের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদেরকে ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িক  দাঙ্গা বাঁধিয়ে আমাদের চট্টগ্রাম দখল করার অপপ্রয়াস চালাচ্ছে তারা।


সূত্র: বিভিন্ন অনলাইন আর্টিকেলের বরাতে

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

মন্তব্য করুন (0)

নবীনতর পূর্বতন