আমারও একটি পাখি ছিলো


সেই ছোট্ট বেলায় একটি পাখির গল্প শুনতাম। সুন্দর পাখি। মিষ্টি পাখি। পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে দামী, সবচেয়ে মিষ্টি পাখি। আমার ছোট্ট মনে সেই পাখিটিকে পোষার এক ব্যগ্র ভাবনার উদয় হলো। আমিও পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর পাখিটিকে পোষবো। তার সাথে ভাব জমাবো । রাতের গহীনে বাগানের মৃদ বাতাসে তার সাথে গপ্প করবো। খৈ ভাজা খাওয়াবো। সকালে যখন ঘুম থেকে উঠবো সবার আগে তার সাথে কথা বলবো। তাকে আমার সব সমস্যার কথা বলবো, যে আমাকে আমার সমস্যার সমাধান দিবে। আমার মনের সব দুঃখের কথা তাকে শোনাবো। সে আমার মনের সান্তনার পরশ বুলিয়ে দেবে। সে আমার সুখ-দুঃখের সাথী হবে।


আমি খুঁজতে থাকি সেই পাখিটিকে। হঠাৎ আমার জীবনে কাল বৈশাখীর ঝড় নেমে আসলো৷ সেই ঝড় আমার বাবাকে নিয়ে গেলো।


বাবা চলে যাওয়ার পর কিছুই ভালো লাগতো না। শুধুই মন খারাপ করে বসে থাকতাম। আর মাঝে মাঝে চোখ দিয়ে বাবার সৃতিগুলো অশ্রু হয়ে ঝড়ে পড়তো। তখন আবার আমার ঐ পাখিটির কথা মনে পড়লো। সে যদি আমার কাছে থাকত । দুঃখের যে ফুঁপালো ভাবটা মনের মাঝে বাসা বেঁধেছে। সেটা দূর হয়ে যেত। কিন্তু আমি কি করবো, আমি তো ছোট। দিনগুলো এভাবেই কাটতে থাকলো। সময় বয়ে যেতে থাকলো। কিন্তু আমার মনের কোন পরিবর্তন বুঝা গেলো না। সবসময় আমার মন বিষণ্ণ থাকতো। তাই সবাই মিলে বহু খুঁজাখুঁজি করে আমাকে একটি পাখি এনে দিলো। সেই সুন্দর পাখিটি। আমি সেই ছোট্ট পাখির ছানাটিকে একটি সুন্দর খাঁচায় রেখে দিলাম। এবং নিয়মিত খানা-দানা খাওয়াতে লাগলাম। আমার এই পাখির মধ্যে পৃথিবীর সব ধরনের বৈশিষ্ট ছিলো। হ্যাঁ, সবধরনের বৈশিষ্ট।


সেই ছোট্ট ছানাটি আস্তে আস্তে বড় হতে থাকে। আমিও বড় হতে থাকি। দীর্ঘদিন পর পাখিটি সুঠাম দেহের আধিকারী হয়। যেই দেখতো সেই বলতো মাশা-আল্লাহ।


আমি পাখিটিকে আগের চেয়ে বেশি যত্ন করতে লাগলাম। পাখিটি প্রভাতকালে খাঁচা থেকে উড়ে যেত। সারাদিন ঘুরাফেরা করে সেই গোধূলী লগ্নে আবার ফিরে আসতো তার আপন জায়গায়। হঠাৎ একদিন ঘটে গেলো এক লৌমহর্ষক ঘটনা।


 নিত্যদিনের মতো সেদিনও ছুটে গিয়েছিলো কোন এক বনে। এক শিকারী ছেলে ধরে নিয়ে গেলো আমার প্রতিভাবান পাখিটিকে। পাখি হারানোর ব্যাথা আমাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিলো। সেই খাঁচাটি এখন শূন্য পড়ে আছে। আমি অপেক্ষায় থাকলাম এই আশায় যে, কোন একদিন হয়তো ফিরে আসবে আমার পাখিটি। কিন্তু দীর্ঘদিন অপেক্ষা করার পরও ফিরে আসলো না আমার প্রিয় পাখিটি।


আমি এখন অন্যন্যা পাখির পরিবারকে সেই খাঁচায় থাকতে দিলাম । খাঁচা ভরে গেলো । কিন্তু আমার মনের খাঁচায় এখনো শূন্যতা বিরাজমান ।


কয়েকমাস পর হঠাৎ একদিন সেই পাখিটি এসে আমার বাড়ির উঠোনের লেবু গাছে বসলো। তাকে দেখে আমার কলিজায় পানির সঞ্চার হলো। আমি দৌড়ে ঘরে গেলাম এবং কিছু খরকুটা এনে উঠোনে ছিটিয়ে দিলাম। কিন্তু সে খেতে আসছে না। আমার চোখ দু'টো অশ্রুসিক্ত হয়ে গেলো।


 আমি গভীরভাবে প্রত্যক্ষ্য করছিলাম। সে বার বার খাঁচার উপর গিয়ে বসছিলো। আমি বেশি করে খাবার ছিটিয়ে দিলাম। না, তবুও আসছে না। হঠাৎ করে সে আবার উড়ে গেলো অচেনা কোন রাজ্যে।


ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে বিছানায় শুয়ে আছি। কিন্তু কিছুতেই ঘুম আসছিলো না। শুধু এপাশ ওপাশ করছিলাম। জানালা খুলে দিলাম। জোৎস্না রাত। চাঁদের এক চিলতে আলো নেমে এলো আমার বিছানায়। আমি চাঁদের নিষ্পাপ চেহারার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে বিরই পালন করছিলাম । প্রিয় পাখির চলে যাওয়ার বিরহ। একেবারে কাছের প্রিয় বন্ধুটিকে হারাবার বিরহ। ভাবতে ভাবতে কখন যেনো ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুমের মধ্যে এক আজব স্বপ্ন দেখলাম।


"আমি যেভাবে শুয়ে ছিলাম সেভাবেই শুয়ে আছি। হঠাৎ করে সেই পাখিটি জানালা দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলো এবং আমার বুকের উপর এসে বসলো। আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। স্বপ্নের মধ্যেই আমি স্বজাগ হয়ে গেলাম । পাখিটি আমার হাত থেকে উড়ে গিয়ে বাইরে চলে গেলো । আমি দৌড়ে দরজা খুলে বাইরে গেলাম । দেখি, আমার প্রিয় পাখিটি খাঁচার ভেতর বসে আছে।


সাথে সাথেই ঘুম ভেঙ্গে গেলো আমার। বিছানা থেকে উঠে বাইরে গিয়ে দেখি খাঁচার ভেতর পাখিগুলো বসে আছে। বুঝতে আর দেরি হলো না আমার। সবগুলো পাখিকে মুক্ত করে দিলাম। সবগুলো পাখি পাষাণের মতো উড়ে গেলো। আমি আবার গিয়ে শুয়ে পড়লাম। আরও কয়েকদিন পর।


পাখির কিচিরমিচির শব্দে আমার ঘুম ভাঙ্গে। বাইরে গিয়ে ওযু করে গামছা দিয়ে হাত মোছার সময় আমার দৃষ্টি গিয়ে পড়ে খাঁচার উপর। আমার চক্ষু চড়কগাছ!। সত্যিই কি তাই? নাকি স্বপ্ন। আমি এগিয়ে গেলাম।


-কোথায় গিয়েছিলে তুমি?


-দূরে। অনেক দূরে।


-সেদিন এলে, আবার চলে গেলে। একটা খরকুটাও খেলেনা, অভিমান করেছিলে বুঝি?


-আমার বাসায় এ পাখিগুলো ছিলো। আমি তাদের সাথে থাকতে পারবো না। তাই ভারাক্লান্ত হৃদয় নিয়ে ফিরে গিয়ে ছিলাম 


-কেন! তাদের সাথে থাকতে পারবে না কেন?


-তারা দুষ্টু প্রকৃতির এবং.....


আমার সেই পাখিটি আবার ফিরে এসেছে। কিন্তু সে আগের মত নেই । অনেকটা শুকিয়ে গেছে আলহামদুলিল্লাহ। আজ থেকে আবার নিয়মিত খাবার দেবো। আপনারা দু'আ করবেন যেন আমার পাখিটি আবার আগের মত তরতাজা হয়ে উঠে।



উল্লেখ্য: এই গল্পে পাখি চরিত্রটি রূপকার্থে ব্যবহার করা হয়েছে। মূলত পাখির মাধ্যমে লেখক অন্য কিছু বুঝাতে চেয়েছেন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

মন্তব্য করুন (0)

নবীনতর পূর্বতন