ঘড়ির কাঁটা যখন রাত ১২টা ছুঁইছুঁই, চারদিকে তখন আতশবাজির ঝলকানি আর আকাশফাঁটা আওয়াজ। পুরো পৃথিবী যেন এক উন্মাতাল উৎসবে মেতে ওঠে। কিন্তু আপনি কি জানেন, যে উৎসবের জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করা হচ্ছে, তার শিকড় প্রোথিত আছে হাজার বছরের পুরনো এক পৌত্তলিক বিশ্বাসে? যে উৎসবে আমরা শামিল হচ্ছি, তার পেছনে লুকিয়ে আছে রোমান দেবতা ‘জানুস’ আর পৌত্তলিকদের অদ্ভুত সব রীতিনীতি। আজ আমরা ‘কি কেন কিভাবে’ স্টাইলে উন্মোচন করবো থার্টি ফার্স্ট নাইটের সেই অজানা ইতিহাস।
উৎপত্তি ও আদি ইতিহাস: মেসোপটেমিয়া থেকে রোম
থার্টি ফার্স্ট নাইট বা ইংরেজি নববর্ষ পালনের ইতিহাস প্রায় ৪০০০ বছরের পুরনো। তবে মজার ব্যাপার হলো, আজকের মতো তখন ১লা জানুয়ারিতে নববর্ষ শুরু হতো না।
১. প্রাচীন ব্যাবিলনীয় সভ্যতা (খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ অব্দ):
ইতিহাসবিদদের মতে, মেসোপটেমীয় (ব্যাবিলনীয়) সভ্যতায় প্রথম নববর্ষ পালন শুরু হয়। তবে তারা এটি পালন করত মার্চ মাসের শেষ দিকে, বসন্তের আগমনে যখন দিন ও রাত সমান হতো। তাদের এই উৎসবের নাম ছিল ‘আকিতু’ (Akitu)। এটি ছিল মূলত তাদের কৃষি ও মূর্তিপূজার একটি অংশ। তারা ১১ দিনব্যাপী বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের দেবতাদের সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করত।
২. রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার ও দেবতা ‘জানুস’:
জানলে অবাক হবেন, রোমান ক্যালেন্ডারে আগে মাস ছিল মাত্র ১০টি এবং বছর শুরু হতো মার্চ থেকে। কিন্তু খ্রিষ্টপূর্ব ৪৬ অব্দে সম্রাট জুলিয়াস সিজার ক্যালেন্ডারে ব্যাপক পরিবর্তন আনেন। তিনি জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারি মাস যুক্ত করেন।
তিনি জানুয়ারি মাসের নামকরণ করেন রোমান দেবতা ‘জানুস’ (Janus)-এর নামানুসারে। পৌরাণিক কাহিনী মতে, জানুসের দুটি মুখ ছিল—একটি সামনের দিকে (ভবিষ্যতের প্রতীক) এবং অন্যটি পেছনের দিকে (অতীতের প্রতীক)। রোমানরা বিশ্বাস করত, বছরের এই সন্ধিক্ষণে জানুস দেবতা তাদের অতীত ও ভবিষ্যতের রক্ষাকর্তা। সেই থেকেই ১লা জানুয়ারিকে কেন্দ্র করে উৎসবের শুরু এবং আগের রাত অর্থাৎ ৩১শে ডিসেম্বর হলো সেই প্রস্তুতির রাত।
মধ্যযুগ ও খ্রিষ্টধর্মের প্রভাব
একটা সময় মধ্যযুগীয় ইউরোপে খ্রিষ্টান চার্চগুলো এই উৎসবকে ‘পৌত্তলিকতা’ বা ‘বিজাতীয় সংস্কৃতি’ হিসেবে নিষিদ্ধ করেছিল। কারণ এতে মদ, নাচ এবং অনৈতিক কর্মকাণ্ডের আধিক্য ছিল। পরবর্তীতে ১৫৮২ সালে পোপ গ্রেগরি ত্রয়োদশ ‘গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার’ প্রবর্তন করলে পুনরায় ১লা জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে নববর্ষ হিসেবে স্বীকৃতি পায় এবং থার্টি ফার্স্ট নাইট উদযাপনের প্রথাটি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে।
ইসলামের আলোকে থার্টি ফার্স্ট নাইট: একটি গবেষণাধর্মী বিশ্লেষণ
একজন মুসলিম হিসেবে থার্টি ফার্স্ট নাইট বা ইংরেজি নববর্ষ উদযাপনের বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। ইসলামের মৌলিক আকিদা ও সংস্কৃতির সাথে এর সরাসরি সংঘর্ষ রয়েছে। চলুন বিষটি বিশ্লেষণ করি:
১. বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুসরণ (তাশাব্বুহ):
ইসলামের একটি মৌলিক মূলনীতি হলো অন্য কোনো ধর্মের ধর্মীয় বা বিশেষ আধ্যাত্মিক রীতিনীতি অনুকরণ না করা। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি অন্য কোনো জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত গণ্য হবে।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৪০৩১)
যেহেতু থার্টি ফার্স্ট নাইটের শিকড় রোমান পৌত্তলিকতা ও দেব-দেবীর আরাধনায় নিহিত, তাই এটি পালন করা পরোক্ষভাবে সেই সংস্কৃতিকেই লালন করা।
২. সময়ের অপচয় ও অনৈতিকতা:
ইসলামে প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। থার্টি ফার্স্ট নাইটের নামে বর্তমান বিশ্বে যা হয়—অশ্লীল নাচ-গান, মদ্যপান, পটকা ফোটানো এবং বেহায়াপনা—তা ইসলামের দৃষ্টিতে স্পষ্ট হারাম বা নিষিদ্ধ। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
"নিশ্চয়ই অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই।" (সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত: ২৭)
৩. পরকালের ভাবনা বনাম উৎসব:
বছরের শেষ রাতটি হওয়া উচিত ছিল আত্মসমালোচনার (মুহাসাবাহ)। গত এক বছরে আমি কতটুকু নেক আমল করেছি আর কতটুকু গুনাহ করেছি, তার হিসাব মেলানোর রাত এটি। অথচ উৎসবে মেতে মানুষ সেই আত্মজিজ্ঞাসা থেকে দূরে সরে যায়।
আমাদের করণীয় কী?
আমরা যারা ‘কি কেন কিভাবে’র দর্শক বা পাঠক, আমাদের উচিত ইতিহাসের সত্যতাকে জানা। ক্যালেন্ডারের পাতা পরিবর্তন হওয়া একটি প্রাকৃতিক বিষয়। এটি কোনো উৎসবের উপলক্ষ হতে পারে না যা সমাজে বিশৃঙ্খলা বা অপসংস্কৃতি ছড়ায়।
একজন সচেতন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি হওয়া উচিত:
সচেতনতা বৃদ্ধি: পরিবারের ছোটদের এই উৎসবের পৌত্তলিক ইতিহাস সম্পর্কে জানানো।
সময়কে গুরুত্ব দেওয়া: আতশবাজি পুড়িয়ে অর্থ ও পরিবেশ নষ্ট না করে অভাবী মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
প্রার্থনা: নতুন বছরে আল্লাহর কাছে কল্যাণ ও গুনাহ মাফের দোয়া করা।
উপসংহার
ইতিহাস সাক্ষী দিচ্ছে, থার্টি ফার্স্ট নাইট কোনো আধুনিক বা প্রগতিশীল উৎসব নয়, বরং এটি প্রাচীন পৌত্তলিক বিশ্বাসের এক আধুনিক রূপান্তর। মুসলিম হিসেবে আমাদের রয়েছে নিজস্ব সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও হিজরি ক্যালেন্ডার। বিজাতীয় সংস্কৃতির জোয়ারে গা ভাসিয়ে না দিয়ে নিজের ঈমান ও আমল রক্ষা করাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন