বৃষ্টি ভেজা লাশ!

সকাল থেকেই আকাশটা যেন অজানা কোনো বেদনার ভারে নুয়ে পড়েছে। মেঘের বুক চিরে অনবরত সকর ঝরছে বৃষ্টি। হাড় কাঁপানো শীতল বাতাসের সাথে প্রকৃতিতে মিশে আছে এক ধরনের বিষণ্ণতা। কেমন যেন থেমে গেছে সবকিছু। স্থবির হয়ে পড়েছে জীবন, থেমে গেছে তার স্পন্দন, কোলাহল হারিয়ে গেছে, সবখানে শুধু রয়ে গেছে এক অদ্ভুত নীরবতা। 


সারাদিনের অনবরত ঝিমঝিম বর্ষণে ঘরবন্দী থাকার পর ভাবলাম একটু বের হওয়া যাক। মেঘে ঢাকা আকাশের ন্যায় বিষণ্ণ মনকে কিছুটা প্রফুল্ল করা যাক। কিন্তু উঠোন পেরোতেই দেখি, পাড়ার খেলার মাঠে জমে আছে লোকজনের ভিড়। প্রথমে মনে হলো, কোনো খেলার প্রস্তুতি হয়তো। কিন্তু লোকজনের পরিধেয় পোশাক ও অবনত মস্তক দেখে বুঝতে পারলাম, এখানে কারও শেষ বিদায়ের আয়োজন চলছে। প্রিয় সেই মানুষটিকে শেষ বিদায় জানানোর জন্যই মানুষের এই ভিড়। 


ধীরে ধীরে ভিড়ের নিকবর্তী হলাম। প্রতিটি মুখে ছেয়ে আছে বিষাদের কালো ছায়া। মানুষের সুখ ও শোক, উভয়টা সংক্রামক। যদিও বেরিয়েছিলাম একটু প্রফুল্লতার ইচ্ছায়, তবে বিষণ্ণতার সেই কালো ছায়া আচ্ছন্ন করে ফেলল আমার মনটাকেও। ভেতরে অনুভূত হলো গভীর বিষণতা। 


সেখানেই স্থীর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম অনেকক্ষণ। কারো মুখে কোনো শব্দ নেই। এই ঝিরঝিরে বৃষ্টির মধ্যেও সবাই শান্ত ছেলের মতো ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে। সবার ভেতরই আজ এক অদ্ভুত নীরবতা, যার গভীরে লুকিয়ে আছে অসীম বেদনা। এই নিরন্তর বৃষ্টিপাত আজ কাউকে বিরক্ত করতে পারছে না, বরং এই বর্ষণ যেন সেই নীরবতাকে আরও গভীর, আরও অর্থবহ করে তুলছে। 


বৃষ্টিকে উপেক্ষা করেই লোকজন আসছে। একে একে এসে জড়ো হচ্ছে প্রিয়জনকে বিদায় জানাতে। যদিও সেই প্রধান অতিথীর আগমন এখনো হয়নি। সবাই তার অপেক্ষায় অপেক্ষমাণ। 


কিছুক্ষণ পর...নিয়ে আসা হলো প্রধান অতিথীকে। যার জন্য আজকের এই বৃষ্টিস্নাত আয়োজন। সাদা কাফনে মোড়ানো নিথর দেহখানি শুয়ে আছে খাটিয়ায়। বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা যেন তার নিঃশব্দ কবরগাথা রচনা করে চলছে। সেদিনও যে শরীরে ছিল জীবন, শক্তি ও সাহস, আজ তা কেবলই নিথর। 


এই মানুষটাই কি না একদিন মাটির বুকে পা রেখে, শক্ত পায়ে দৃপ্ত কণ্ঠে মাটি কাঁপিয়েছিল! আজ তার সেই পা, সেই কণ্ঠ, সেই বল কোথায়? আজ কেন সে অন্যের কাঁধে বোঝা হয়ে শুয়ে আছে? যে মানুষটির সমাজে অনুপম সম্মান ছিল, ছিল বিত্ত-বৈভব, আজ কেন তাকে কেউ আর নাম ধরে ডাকে না? 


এইতো সেদিনও মাটির উপর দাঁপিয়ে বেড়িয়েছে লোকটা। সেনাবাহিনীর পোশাকাবৃত হয়ে, পায়ে মজবুত জুতা পড়ে, লেফট-রাইট লেফট-রাইট রব তোলে। কিন্তু আজ! কত নিথর হয়ে শুয়ে আছে সে। শরীরে এক টুকরো সাদা কাফন ছাড়া কিছু নেই। পায়ে জুতা নেই। দেহে বল নেই। নেই নিঃশ্বাস গ্রহণ করার ক্ষমতাটুকুও। কিন্তু কেন? আমার মতো তার শরীরেও তো রক্ত, পানি, ঘাম ছিল। দেহে শক্তি ছিল। মনে বল ছিল। কোথায় গেলো তার শক্তি-সাহস, ক্ষমতা। কেন সে আজ অন্যের কাঁধে বোঝা হয়ে শুয়ে আছে। কেন সে নিজ শক্তিতে হাঁটতে পারছে না। চলতে পারছে না। সমাজে তো সে বিত্ত ছিলো। তাহলে আজ কেন মানুষ তার নাম ধরে ডাকছে না। 


বৃষ্টিতে ভিজে ভিজেই জানাজা পড়লাম। মনের মধ্যে কিছু একটা পরিবর্তন অনুভব করলাম। কি যেনো এক অজানা চিন্তায় ডুবে যেতে চাইছে আমার মন। কিন্তু পারছে না। কোনো এক বিষয় তাকে ভাবতে বাধা দিচ্ছে। অন্য কিছুতে ব্যস্ত রাখতে চাইছে। 


কাফনে মোড়ানো দেহটাকে কবরের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। রিমঝিম বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা যেন কাফনের সাদা কাপড়ের উপর ধুয়ে দিচ্ছে জীবনের শেষ চিহ্নগুলো। ধীরে ধীরে দৃষ্টির আড়াল হয়ে যাচ্ছে সেই দেহটি। মনে হচ্ছে বৃষ্টিভেজা সেই লাশটি আমাকে চিৎকার করে বলছে 'একদিন তুমিও হবে লাশ!'

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

মন্তব্য করুন (0)

নবীনতর পূর্বতন