ভাটাপুরি বিল


নান্দাইলের এক অজপাড়াগাঁ। শহরের সাথে সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই এই গ্রামের। মফস্বল থেকে বেশ দূরে এবং পিছঢালা পথ থেকে অনেকটাই গভীরে অবস্থিত এই গ্রাম। নাম সংগ্রামকেলী। অনেককে ‘সংগ্রামখেলী’ লিখতেও দেখেছি এবং বিভ্রান্ত হয়েছি। কাগজ-কলমে সংগ্রামকেলী লিখলেও, গ্রামের সরলমনা কৃষক-কৃষাণীরা জিহ্বার কসরতের কথা ভেবে তা উচ্চারণ করতে নারাজ। আর যারা বইয়ের ‘ব’ ও পড়েনি, তারা এত আজাল ভেজালে না গিয়ে সংক্ষেপে ‘সংগ্রাহিল’ ডাকতেই স্বস্তি বোধ করেন। কেন এত কঠিন নামে নামকরণ করা হলো, সেই কারণ বা ইতিহাস কোনোটিই জানা নেই আমার।


সারা গ্রাম জুড়ে কোনো নদীর দেখা না মিললেও খাল-বিল রয়েছে যথেষ্ট। ‘ভাটাপুরী’ এই গ্রামেরই একটি বিলের নাম। চৈত্রের কোনো এক রৌদ্রময়ী দুপুরে ভাটাপুরীর কুল ঘেঁষা ছোট্ট একটি মাটির ঘরেই অনুরিত হয় আমার প্রথম চিৎকার। এরপর থেকেই সংগ্রামকেলী আমার, আর আমি সংগ্রামকেলীর। সংগ্রামকেলী আমার জন্মভূমি, মাতৃভূমি। সংগ্রামখেলী মমতাময়ী মায়ের মত, খুব রূপসী চাঁদের মত, বিলের স্বচ্ছ পানির মত।


এই আধুনিক যুগে এসেও সংগ্রামকেলী যেন সেই প্রাচীন যুগেই রয়ে গেছে। তার বয়স যেন আটকে আছে। এখনো সংগ্রামকেলীর বাতাসে ভাসে সেই প্রাচীন যুগের গন্ধ। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে সবকিছুই যেখানে সম্মুখপানে ছুটে চলেছে, সংগ্রামকেলী সেখানে ঠায় দাঁড়িয়ে। সময়ের পালাবদলে পরিবর্তন ঘটেছে সবকিছুর। তথাকথিত  উন্নতি হয়েছে সবখানে, হয়নি শুধু সংগ্রামকেলীতে। এজন্য আমি গর্বিত।


সংগ্রামকেলীতে নেই আধুনিকতার ছোঁয়া, নেই কল-কারখানার ধোঁয়া। আরো অনেক কিছুই নেই। রাস্তায় জ্যাম নেই, মাদকের আড্ডা নেই, বেহায়াপনার সয়লাব নেই, খুব বেশি দুর্নীতি নেই, নেই দূষিত পরিবেশ, বত্রিশ নারী মুচড়িয়ে ওঠা দুর্গন্ধ, ড্রেনভর্তি ময়লা। নেই সাবেক কালের কোনো দৃষ্টিনন্দন মসজিদ বা স্থাপনা, যা দূর থেকে এসে দেখা যায়।


তবে, যা আছে, তা হলো সংগ্রামকেলীর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। এখানকার মানুষজন একে অপরের সাথে যে হৃদ্যতা ও সখ্যতা বজায় রাখে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। গ্রামের প্রতিটি মানুষের মধ্যে রয়েছে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার মনোভাব। সন্ধ্যা হলেই সবাই মিলে গ্রামের এক কোণায় বসে গল্পগুজব করে, হাসিখুশিতে সময় কাটায়। এ যেন এক পরিবারের মতো।


সংগ্রামকেলীতে সকালের আলো যখন উঠতে শুরু করে, তখন পাখির কলরবে মুখরিত হয়ে ওঠে চারপাশ। শিশুরা মেতে ওঠে খেলার সুরে। এখানকার স্কুলে শিক্ষকরা ছাত্রছাত্রীদের এমন ভালোবাসা ও যত্নে শিক্ষা দেন, যা কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়। তারা জীবনের নীতি-নৈতিকতার শিক্ষাও প্রদান করেন। ছোট্ট খেলার মাঠে দেখা যায় কৃষক-কৃষাণীদের পরিশ্রমী হাতের স্পর্শে সোনালী ফসলের খেলা।


গ্রামের বাজারে গেলে দেখা মেলে তাজা শাকসবজি, টাটকা মাছ আর মিষ্টি ফলের সমারোহ। বাজারের মাঝখানে বসে থাকা দোকানির হাসি আর অতিথির প্রতি আন্তরিকতার ছোঁয়া গ্রামের সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে তোলে। গ্রামের বটগাছের তলায় বসে গ্রামের প্রবীণরা যখন পুরনো দিনের গল্প বলে, তখন মনে হয় সময় যেন থমকে দাঁড়িয়ে আছে।


সংগ্রামকেলীর প্রাকৃতিক পরিবেশ সত্যিই মনোরম। বর্ষার দিনে বিলের পানি যখন উপচে পড়ে, তখন মনে হয় প্রকৃতির নিজ হাতে আঁকা এক অপূর্ব চিত্রকর্ম। বিলের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দেখা যায় সবুজ ধানক্ষেত, যেখানে শীতের সকালে শিশির বিন্দুরা মুক্তার মত ঝকমক করে। সন্ধ্যায় যখন আকাশে লাল সূর্যাস্তের রং মেশে, তখন প্রকৃতি তার সর্বোচ্চ সৌন্দর্য প্রকাশ করে।


সংগ্রামকেলীর মানুষের জীবনধারা অনেক সরল। এখানে মানুষ প্রকৃতির সাথে মিলেমিশে থাকে। তাদের জীবনের প্রতিটি দিন প্রকৃতির সাথে সম্পৃক্ত। কৃষিকাজ, মাছ ধরা, গরু-ছাগল পালন, এসবই তাদের জীবনের অংশ। গ্রামের মাটি, পানি, আকাশ, বাতাস—সবকিছুই তাদের জীবনের সাথে গভীরভাবে যুক্ত।


সংগ্রামকেলী শুধু একটি গ্রাম নয়, এটি একটি আবেগ, একটি ভালোবাসার জায়গা। এখানে নেই কোনো মেকি জীবনধারা, নেই কোনো চমকপ্রদ আলোর ঝলকানি। এখানে যা আছে, তা হলো নির্মল প্রকৃতি, আন্তরিক মানুষ, এবং সাদাসিধে জীবন। সংগ্রামকেলীর প্রতি আমার এই ভালোবাসা চিরন্তন। এই ভালোবাসার গভীরতা কখনোই কমবে না, বরং সময়ের সাথে সাথে আরও বাড়বে।


সংগ্রামকেলী আমাকে শিখিয়েছে প্রকৃতির সাথে কিভাবে থাকতে হয়, কিভাবে সহজ-সরল জীবনে সুখ খুঁজে পেতে হয়। এ গ্রামের প্রতি আমার এই ভালোবাসা হৃদয়ের অন্তস্থল থেকে উৎসারিত, যা কখনোই ম্লান হবে না। সংগ্রামখেলী আমার গর্ব, আমার অহংকার।সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই এই গ্রামের। মফস্বল থেকে বেশ দূরে এবং পিছঢালা পথ থেকে অনেকটাই গভীরে অবস্থিত এই গ্রাম। নাম সংগ্রামকেলী। অনেককে ‘সংগ্রামখেলী’ লিখতেও দেখেছি এবং বিভ্রান্ত হয়েছি। কাগজ-কলমে সংগ্রামকেলী লিখলেও, গ্রামের সরলমনা কৃষক-কৃষাণীরা জিহ্বার কসরতের কথা ভেবে তা উচ্চারণ করতে নারাজ। আর যারা বইয়ের ‘ব’ ও পড়েনি, তারা এত আজাল ভেজালে না গিয়ে সংক্ষেপে ‘সংগ্রাহিল’ ডাকতেই স্বস্তি বোধ করেন। কেন এত কঠিন নামে নামকরণ করা হলো, সেই কারণ বা ইতিহাস কোনোটিই জানা নেই আমার।


সারা গ্রাম জুড়ে কোনো নদীর দেখা না মিললেও খাল-বিল রয়েছে যথেষ্ট। ‘ভাটাপুরী’ এই গ্রামেরই একটি বিলের নাম। চৈত্রের কোনো এক রৌদ্রময়ী দুপুরে ভাটাপুরীর কুল ঘেঁষা ছোট্ট একটি মাটির ঘরেই অনুরিত হয় আমার প্রথম চিৎকার। এরপর থেকেই সংগ্রামকেলী আমার, আর আমি সংগ্রামকেলীর। সংগ্রামকেলী আমার জন্মভূমি, মাতৃভূমি। সংগ্রামখেলী মমতাময়ী মায়ের মত, খুব রূপসী চাঁদের মত, বিলের স্বচ্ছ পানির মত।


এই আধুনিক যুগে এসেও সংগ্রামকেলী যেন সেই প্রাচীন যুগেই রয়ে গেছে। তার বয়স যেন আটকে আছে। এখনো সংগ্রামকেলীর বাতাসে ভাসে সেই প্রাচীন যুগের গন্ধ। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে সবকিছুই যেখানে সম্মুখপানে ছুটে চলেছে, সংগ্রামকেলী সেখানে ঠায় দাঁড়িয়ে। সময়ের পালাবদলে পরিবর্তন ঘটেছে সবকিছুর। তথাকথিত  উন্নতি হয়েছে সবখানে, হয়নি শুধু সংগ্রামকেলীতে। এজন্য আমি গর্বিত।


সংগ্রামকেলীতে নেই আধুনিকতার ছোঁয়া, নেই কল-কারখানার ধোঁয়া। আরো অনেক কিছুই নেই। রাস্তায় জ্যাম নেই, মাদকের আড্ডা নেই, বেহায়াপনার সয়লাব নেই, খুব বেশি দুর্নীতি নেই, নেই দূষিত পরিবেশ, বত্রিশ নারী মুচড়িয়ে ওঠা দুর্গন্ধ, ড্রেনভর্তি ময়লা। নেই সাবেক কালের কোনো দৃষ্টিনন্দন মসজিদ বা স্থাপনা, যা দূর থেকে এসে দেখা যায়।


তবে, যা আছে, তা হলো সংগ্রামকেলীর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। এখানকার মানুষজন একে অপরের সাথে যে হৃদ্যতা ও সখ্যতা বজায় রাখে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। গ্রামের প্রতিটি মানুষের মধ্যে রয়েছে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার মনোভাব। সন্ধ্যা হলেই সবাই মিলে গ্রামের এক কোণায় বসে গল্পগুজব করে, হাসিখুশিতে সময় কাটায়। এ যেন এক পরিবারের মতো।


সংগ্রামকেলীতে সকালের আলো যখন উঠতে শুরু করে, তখন পাখির কলরবে মুখরিত হয়ে ওঠে চারপাশ। শিশুরা মেতে ওঠে খেলার সুরে। এখানকার স্কুলে শিক্ষকরা ছাত্রছাত্রীদের এমন ভালোবাসা ও যত্নে শিক্ষা দেন, যা কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়। তারা জীবনের নীতি-নৈতিকতার শিক্ষাও প্রদান করেন। ছোট্ট খেলার মাঠে দেখা যায় কৃষক-কৃষাণীদের পরিশ্রমী হাতের স্পর্শে সোনালী ফসলের খেলা।


গ্রামের বাজারে গেলে দেখা মেলে তাজা শাকসবজি, টাটকা মাছ আর মিষ্টি ফলের সমারোহ। বাজারের মাঝখানে বসে থাকা দোকানির হাসি আর অতিথির প্রতি আন্তরিকতার ছোঁয়া গ্রামের সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে তোলে। গ্রামের বটগাছের তলায় বসে গ্রামের প্রবীণরা যখন পুরনো দিনের গল্প বলে, তখন মনে হয় সময় যেন থমকে দাঁড়িয়ে আছে।


সংগ্রামকেলীর প্রাকৃতিক পরিবেশ সত্যিই মনোরম। বর্ষার দিনে বিলের পানি যখন উপচে পড়ে, তখন মনে হয় প্রকৃতির নিজ হাতে আঁকা এক অপূর্ব চিত্রকর্ম। বিলের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দেখা যায় সবুজ ধানক্ষেত, যেখানে শীতের সকালে শিশির বিন্দুরা মুক্তার মত ঝকমক করে। সন্ধ্যায় যখন আকাশে লাল সূর্যাস্তের রং মেশে, তখন প্রকৃতি তার সর্বোচ্চ সৌন্দর্য প্রকাশ করে।


সংগ্রামকেলীর মানুষের জীবনধারা অনেক সরল। এখানে মানুষ প্রকৃতির সাথে মিলেমিশে থাকে। তাদের জীবনের প্রতিটি দিন প্রকৃতির সাথে সম্পৃক্ত। কৃষিকাজ, মাছ ধরা, গরু-ছাগল পালন, এসবই তাদের জীবনের অংশ। গ্রামের মাটি, পানি, আকাশ, বাতাস—সবকিছুই তাদের জীবনের সাথে গভীরভাবে যুক্ত।


সংগ্রামকেলী শুধু একটি গ্রাম নয়, এটি একটি আবেগ, একটি ভালোবাসার জায়গা। এখানে নেই কোনো মেকি জীবনধারা, নেই কোনো চমকপ্রদ আলোর ঝলকানি। এখানে যা আছে, তা হলো নির্মল প্রকৃতি, আন্তরিক মানুষ, এবং সাদাসিধে জীবন। সংগ্রামকেলীর প্রতি আমার এই ভালোবাসা চিরন্তন। এই ভালোবাসার গভীরতা কখনোই কমবে না, বরং সময়ের সাথে সাথে আরও বাড়বে।


সংগ্রামকেলী আমাকে শিখিয়েছে প্রকৃতির সাথে কিভাবে থাকতে হয়, কিভাবে সহজ-সরল জীবনে সুখ খুঁজে পেতে হয়। এ গ্রামের প্রতি আমার এই ভালোবাসা হৃদয়ের অন্তস্থল থেকে উৎসারিত, যা কখনোই ম্লান হবে না। সংগ্রামখেলী আমার গর্ব, আমার অহংকার।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

মন্তব্য করুন (0)

নবীনতর পূর্বতন