খাইরুল লো... তোর লম্বা মাথার কেশ....
মিনমিনে একটি আওয়াজ ভেসে আসছে দূর থেকে। বন্ধুদের সাথে কড়ই গাছতলায় খেলায় মগ্ন থাকা ছোট্ট লেদু কান দুটো খাড়া করে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছে, এটা কি সেই আওয়াজ কি না যার জন্য সে দিনের পর দিন অপেক্ষা করে।
ক্রমশই আওয়াজটা নিকটবর্তী হচ্ছে। লেদু হাতে থাকা মারবেলের ঝনঝনানি থামিয়ে চুপ করে শুনার চেষ্টা করছে। আইসক্রিমের গাড়িটা মসজিদের সামনের মোড় থেকে যখন লেদুর বাড়ির রাস্তার দিকে ফিরেছে, মারবেলগুলো দুহাতে নিয়ে হাফপ্যান্টে গুজতে গুজতে এক ভোঁ দৌড় দিলো সে। ঢিলাঢালা হাফপ্যান্ট টি বারবার খুলে পড়ে যাচ্ছে। দৌড়তে তার খুব অসুবিধা হচ্ছে। কিছুদুর যাওয়ার পর মারবেল দুটো পড়ে গিয়ে দুদিকে গড়িয়ে যায়। নিমিষের মধ্যেই লেদু সেগুলো হাতে তুলে নেয়। হাফপেন্টের যন্ত্রনায় কাঁদতে ইচ্ছে করছে তার। আজকেই বাজানকে কেঁদে কেঁদে হাফপেন্ট কিনে দিতে বলবে সে। এমনিতেই তাড়াহুড়া- পাছে না আবার আইসক্রীম ওয়ালা চলে যায়। তার উপর আবার এমন ঝক্কি ঝামেলা। আর সহ্য করা নয়। আজই বাজানকে বলতে হবে।
মারবেল কুড়াতে কুড়াতে একবার পেছন ফিরে তাকালো। না। এখনো গাড়ি এয়ে পৌঁছায়নি। তবে বিলম্ব করাও ঠিক হবে না। ততক্ষনে হয়তো হিন্দুবাড়ি পার হয়ে গেছে।
লেদুর মা তার ছোট ভাইকে ঘুম পাড়াচ্ছে। শুয়ে থাকতে থাকতে তার চোখটাও লেগে এসেছে। হঠাৎ দরজা খোলার বিকট আওয়াজে তার চোখের ঘুম উড়ে গেলো। কপাল কুঁচকে পাশের কোঠা থেকেই জিজ্ঞেস করেন—কিরে হতচ্ছাড়া! এমনে কেউ দোর খুলে?
শুধু মা'ই না, ছোট ভাইটাও লাফিয়ে উঠে ক্যাঁ ক্যাঁ করে কাঁদতে শুরু করলো। কে কি বললো আর কে কি করলো তা দেখার সময় লেদুর নেই। ঠুস ঠাস দরজা খুলে সোজা চাল ভর্তি রাশের কাছে গিয়ে তবেই থামলো লেদু। ষ্টিলের গ্লাস দিয়ে এক গ্লাস চাল নিয়ে হনহন করে ছুটে গেলো আবার। মাইকের স্পষ্ট আওয়াজ শুনে আকলি বুঝতে পারলো তার রাশের চাল এক গ্লাস কমে গেছে। ছোটটাকে কোলে নিতে নিতে হাক দিলো- লেদ্দোয়া! খাড়া কইতাছি। তোর আব্বা আইলে থইতো না কইলাম।
টুক টুক শব্দে মাটি কাঁপাতে কাঁপাতে ছুটে চললো লেদু। আকলিও ঘরে দোর দিয়ে পেছন পেছন হাঁটা দিলো।
—ও মিয়া! দুইডা ইস্কিরিম দেইন
—এই কয়ডা চাউল দেয়া দুইডাইস্কিরিম! গ্লাস ভইরা লইয়া যাহ!
বাড়ির বাইরে বের হয়ে আকলি দেখলো তার ছেলে আইস্ক্রিম কিনতে গেছে। এই দৃশ্য দেখে সে মোটেও বিহ্বল হলো না। লেদু প্রায়ই এমন করে। এক গ্লাস চালের ভাত দুবেলা খাওয়া যায়। আর এই হতচ্ছাড়া এক গ্লাস চাল দিয়ে আইসক্রীম কিনে খায়? আজ আসুক লেদুর বাপ। কয়েক ঘাঁ না লাগালে এই ছেলে ভালো হবে না।
আইসক্রীমওয়ালা লক্ষ্য করলো লেদুর মা বিরক্তি নিয়ে এদিকেই আসার চেষ্ঠা করছে। কপালের বলিরেখা দেখে গ্লাস ভর্তি চাল পুরে নিলো ব্যাগে। আকলির দিকে আড়চোখে তাকিয়ে লেদুকে তিরষ্কার করে বলতে লাগলো—দূর বেডা! এই কয়ডা চাউল দিয়া কেউ ইস্কিরিম দেয়? আর কোনদিন এল্লি চাউল লাইয়া আমার বাড়াত আইছ না।
চালগুলো ব্যাগে ঢালতে দেখে আকলি আর আগে বাড়লো না।
—বাইত আইছ আজ্জোয়া! ইস্কিরিম খাওয়াইয়াম তরে। ভালা কইরা খাওয়াইয়াম।
লেদু তার মার কথা শুনলো ঠিকই। কিন্তু তাতে যে তার মনে বিন্দুমাত্র ভয়ের সঞ্চার হয়েছে, তা কিন্তু নয়। সন্ধ্যা হতে এখনো অনেক দেরি। ততক্ষণে সব রাগ উবে যাবে।
-কিরে জিবু খেলতে না?
-খেলবাম । ইস্কিরিমডা খাইয়া লই।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন